দাঁত শির শির করা সমস্যা

0
18
দাত
দাত
দাঁত নড়লে  বা মাড়ি ফুললে আমরা প্রচন্ড সন্ত্রাসে ছুটি দাঁতের ডাক্তারের কাছে। পরম করুনাময়ের দান দন্তরাজি যখন সাহসী সৈন্যদলের মত বছরের পর বছর ধরে গরু,খাসি, মুরগী ও মাছের হাঁড়, চালের কাঁকর ইত্যাদিকে পিষ্ট করে অবশেষে একে একে রণে ভঙ্গ দেয়, তখন তাদের স্থান গ্রহণ করে নতুন রিক্রুট-একটি, দু’টি অথবা একপাটি দুইপাটি নকল দাঁত। আপনারা ভাবছেন চিকিত্সা শাস্ত্রেও এই দন্ত পরিচর্যা বর্তমান শতাব্দীর মৌলিক অবদান? আপনাদের ধারনা দুই-তিন-চারশ বছর আগে দাঁত নড়লে বা পড়লে কিছুই করাবার ছিলনা?  তাহলে মিশরের প্যাপিরাস কাগজে লেখা প্রাচীন নথিপত্র ঘাঁটুন এবং কবরস্থানের দেয়ালের লেখা পড়ুন। তবেই জানতে পারবেন যে, পৃথিবীর প্রাচীনতম দন্ত চিকিত্সক আনুমানিক তিন হাজার খৃষ্টপূর্বাব্দে মিশরের অধিবাসীদের দাঁতের সেবা করে গেছেন। তাঁর চারশ বছর পর দন্ত চিকিত্সায় বিপ্লব আনলেন আরেকজন মিশরবাসী, ফ্যারাও এর ব্যক্তিগত চিকিত্সক পেপিআংখ।

 

বিজ্ঞানীরা মনে করেন সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সুসিদ্ধ নরম খাবার আর নানা রকম মিষ্টি খেতে শিখেই আমাদের দাঁত হয়েছে দুর্বল রোগ-জীবানুর ঘাঁটি। শরীরের সবচেয়ে শক্ত জিনিস দাঁত। কিন্তু এই দাঁতেরও ক্ষয় হয়, যাকে আমরা পোকায় খেয়ে যাওয়া বলি। ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় ডেন্টাল ক্যারিজ। আফ্রিকার আদিম জাতি এবং এস্কিমোদের মধ্যে এই রোগ

 

সবচেয়ে কম। তাই তাদের

 

মধ্যে এই রোগ দেখা যাবে। তাই তাদের দাঁত সুন্দর ঝকঝকে মুক্তোর মতো। কিন্তু তারা যদি সভ্যমানুষের খাবার খায়, তবে তাদের মধ্যে এই রোগ দেখা যাবে। যেমন সুইজারল্যান্ড আল্পস পর্বতের

 

ওপর অবস্থিত গোমস নামক গ্রামগুলিতে যেসব মানুষ থাকে

 

তাদের এই রোগ কয়েক বত্সর আগেও ছিল না। কিন্তু আস্তে

 

আস্তে আধুনিক খাবারের সাথে

 

তারা অভ্যস্ত হয়ে উঠল, ফলে তাদেরও দাঁতের ক্ষয় রোগ শুরু

 

হয়ে গেল। কিন্তু পর্বতের উপর যেখানে রেলপথ পৌঁছায়নি সেখানকার লোকদের দাঁতের

 

রোগ মোটেই হয়নি।

 

আমাদের দেশে দাঁত ও মুখের

 

প্রধান রোগগুলো হচ্ছে ডেন্টাল ক্যারিজ, মাড়ির রোগ বা পেরিওডেন্টাল রোগ, মুখের

 

সাদাত বা ঘা প্রধান।

 

‘বাঙ্গালী দাঁত থাকতে দাঁতের

 

মর্যাদা দিতে জানে না’, এটি

 

একটি প্রচলিত প্রবাদ বাক্য। তবুও কম-বেশী সকলেরই দাঁতের রোগ হয়, দাঁতের ক্ষয় হয় অবশেষে

 

দাঁতকে হারাতে হয়। কারণ শুধু প্রবাদ বাক্য জানা থাকলেই দাঁতের রোগ বন্ধ হয় না । এর জন্য বিজ্ঞানসম্মত কতগুলো নিয়ম-কানুন রয়েছে যা আমাদের দেশের বেশীর ভাগ লোক অবহিত নন। অতি সহজভাবে বলতে গেলে বলতে

 

হবে যে, আমাদের শরীর বা দেহকে সুস্থ ও সবল রাখার জন্য যেমন নিয়মিত কতগুলো বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয় ,তেমনি দাঁতকেও সচল ও সুন্দর করে রাখতে কিছু কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। ইংরেজিতে কথা আছে ‘Mouth is the gateway to health’ অর্থাত্ ‘মুখই স্বাস্থ্যের প্রবেশপথ’। দাঁতের গঠন সৌন্দর্য ও বিন্যাসের উপর ব্যক্তিত্বও

 

অনেকাংশে নির্ভরশীল। বিজ্ঞানীদের মতে দেহের বেশীরভাগ রোগের প্রভাব বা লক্ষণ মুখ গহ্বরে প্রথমে আসে। যেমন ধরুন দেহের

 

প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলেই

 

মুখের ভেতরে তার নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। দেহের এই ইমিউন সিস্টেম বা প্রতিরোধ ক্ষমতা আমাদের দেহকে বাইরের রোগ জীবানু থেকে রক্ষা করে। তবে এই প্রতিরোধ ক্ষমতা নানান কারণে কমে যেতে পারে। যেমন, দেহের অন্যান্য রোগ, ওষুধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া, শরীরে কৃত্রিমভাবে স্থাপিত অঙ্গসমূহের জন্য নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ অথবা ক্যান্সার রোগীদের জন্য নিয়মিত গ্রহণ করা

 

কেমোথেরাপি ইত্যাদি। তাছাড়া দেহের অন্যান্য রোগের জন্য গ্রহণ করা নিয়মিত ওষুধ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হূদরোগ, হাঁপানী পেটের বা হার্টের অসুস্থতা ইত্যাদি। এই সমস্ত রোগের বেশীরভাগই ওঠে মুখের ভেতরে পরিবেশকে শুকিয়ে শুষ্ক করে দেয় । ফলে দেখা দেয় -ডিহাইড্রেশন  বা যাকে বলা হয় ড্রাই মাউথ। মুখের এই সুস্থতার জন্য দেখা দেয় নানান

 

রোগ। যেমন ডেন্টাল ক্যারিজ বা দন্তক্ষয় সেই সাথে জীবানু বা ব্যাকটেরিয়ার বিস্তারও ঘটে। এর ফলে মুখের স্বাদ বা টেস্ট নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ডেন্টিস্ট বা দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ মুখ পরীক্ষা করার সময় এমন অনেক রোগ ও সনাক্ত করেন। যে সমস্ত রোগের উপস্থিতি রোগী নিজেরাও বুঝতে পারে না । এই সমস্ত লক্ষণ দেখা মাত্র ডেন্টিস্ট কখনোবা অন্যান্য মেডিকেল বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করেন। কারণ দেহের অনেক রোগই মুখের ভেতরে প্রাথমিক সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়।

 

যাদের দীর্ঘস্থায়ী রোগ বা সারাজীবনের রোগ আছে যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ তাদেরকে অবশ্যই নিয়মিতভাবে মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পরীক্ষা করা দরকার। কারণ মুখের অনেক সমস্যাই দেহের অন্যান্য রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে অসুবিধার সৃষ্টি করে। অতএব মাড়ির ও দাঁতের সুস্থতা নিয়ন্ত্রণ করা এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রয়োজন। গবেষকরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছেন যে, মুখের ভেতরে মাড়ির রোগ দেহের অন্যান্য রোগ সৃষ্টির প্রধান কারণ হতে পারে। এসব রোগের মধ্যে হূদরোগ ও কম ওজনের শিশু ভূমিষ্ট হওয়া অন্যতম।

 

শরীরের সাথে মনের সম্পর্ক নিয়ে আমরা হয়তো অনেক কিছুই জানি। কিন্তু মুখের সাথে শরীরের সম্পর্ক নিয়ে আমরা কতটুকু জানি? অনেকের কাছে ডেন্টাল ক্লিনিকে আসা মানেই হচ্ছে দাঁত ও মাড়ি পরিষ্কার করা, দাঁত তুলে ফেলা, অথবা দাঁতের ফিলিং করা। তবে ডেন্টাল ক্লিনিকে বা হাসপাতালে যাওয়া শুধুমাত্র দাঁতের জন্য নয়। এটা সম্পূর্ণ দেহের জন্য। কারণ, যা কিছু মুখে ঘটুক না কেন তার প্রভাব দেহের ওপরও পড়ে। অনুরূপভাবে দেহের যেকোনো অঙ্গ রোগাক্রান্ত হলে তার প্রভাবও মুখের উপর আসে।

 

একটি-দুটি দাঁত বা অনেকগুলো দাঁত হঠাত্ কখনো শিরশির করতে পারে। দাঁত শির শির করার অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। যেমন তারা ডাক্তারের কাছে এসে বলেন আমার দাঁতটি শির শির করে, পানি খেতে পারি না, কেউ বা বলেন চা খেতে পারি না। আবার কেউ বলেন ঠান্ডা গরম কিছুই খেতে পারি না, দাঁতে ধরে। দাঁতের এই শির শির করা অবস্থাকেই বলা হয় ডেন্টাল ইরেশান বা এন্ট্রিশন, এই এন্ট্রিশন বা ইরেশান হওয়ার কারণ হচ্ছে দাঁতের উপরের সবচেয়ে শক্ত আবরণ এনামেল ক্ষয় হয়ে যাওয়া। আমরা জানি একটি দাঁতের গঠন প্রক্রিয়ায় প্রথম

 

আবরণটিই হচ্ছে এনামেল, এই এনামেল আমাদের শরীরের সবচেয়ে শক্ত অংশ। যখনই কোনো কারণে এই এনামেল ক্ষয় প্রাপ্ত হয় তখন দাঁতের

 

পরবর্তী অংশ ডেন্টিন বেরিয়ে আসে যেহেতু ডেন্টিনের নিচের অংশেই  নার্ভ, আর্টারি, ব্রাড ভেসালস ইত্যাদি থাকে সেহেতু দাঁতটি খুবই স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে এবং তখনই ঠান্ডা বা গরম কিছু তরল পদার্থ লাগার সাথে সাথেই দাঁতটি শির শির করে। এই এনামেল ক্ষয় হয়ে যাওয়ায় প্রধান কারণ গুলির মধ্যে আছে

 

১. দাঁত ভেঙ্গে যাওয়া

 

২. অতিরিক্ত দাঁত ব্রাশ এর ঘর্ষনে এনামেল ডেন্টিন ক্ষয় হয়ে যাওয়া

 

৩. দাঁতের ক্ষয় হয়ে যাওয়া (ডেন্টাল ক্যারিজ)

 

৪. দাঁত থেকে মাড়ি সরে যাওয়া

 

৫. নকল দাঁত বা ডেন্চার এর ক্রমাগত ঘর্ষন লাগা

 

৬. ক্রাউন ব্রিজ করার ক্ষেত্রে দাঁত কেটে ফেলা

 

৭. দাঁতের ক্র্যাক হওয়া

 

৮. কিছু কিছু বদ অভ্যাস যেমন পেন্সিল বা কলম দিয়ে দাঁত কামড় দিয়ে ধরে রাখা ইত্যাদি।

 

যখনই কোনো দাঁত এ এই ধরণের শিরশির করবে তখনই সেই দাঁতটি পরীক্ষা করে দেখতে হবে কোনো ফাঁটা বা ফাটল আছে কিনা এবং কোনো কারণে এনামেল ক্ষয় হয়েছে কিনা। এসব ক্ষেত্রে একটি এক্সরের মাধ্যমে বোঝা যাবে মাড়ি ও দাঁতের অবস্থান এবং সেই সাথে কোনো গর্ত বা ফাটল এর অবস্থাও নিশ্চিত করা যাবে।

 

চিকিত্সা

 

আজকাল এই ধরণের সমস্যার অতিদ্রুত চিকিত্সা নিশ্চিত করা যায়

 

প্রথমত: চিকিত্সা ব্যবস্থার মধ্যে প্রথমেই মাড়ি ও দাঁতের সংযোগস্থল  থেকে সমস্ত পাথর বা ডেন্টাল প্লাক পরিস্কার করা প্রয়োজন। এই ধরণের কাজে সাধারনত: ডেন্টাল স্কেলিং করা হয় যেমন  আলট্রাসনিক স্কেলিং এর মাধ্যমে সমস্ত দাঁতের গোড়া ও মাড়ি থেকে খাদ্য কনা পরিস্কার করা।

 

দ্ব্বিতীয়ত: ক্ষয়ে যাওয়া অংশটুকু বা ভেঙ্গে যাওয়া অংশটুকু আজকাল খুবই আধুনিক পদ্ধতি লাইট কিউর ফিলিং দিয়ে ভর্তি করে দেয়া যাতে ক্ষয়ে যাওয়া এনামেল এবং ডেন্টিন আবার পুরন হয়ে যায়। এক্ষেত্রে গ্লাস আইনোমার ফিলিং দিয়েও দাঁতটি ভর্তি করা যায়। তবে অতিরিক্ত ক্ষয়ে যাওয়া বা গর্ত হয়ে যাওয়া দাঁতটিকে রুট ক্যানেল চিকিত্সার মাধ্যমে ভর্তি করে ক্রাউন বা মুকুট পরানো যায়।

 

তৃতীয়ত:দাঁতের মাজন – দাঁতের ক্ষয় যদি কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত না হয় তবে ফিলিং বা রুট ক্যানেল চিকিত্সার প্রয়োজন হয় না। সে ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দাঁত ব্রাশের সঙ্গে স্ট্রনিয়াম ক্লোরাইড সংযুক্ত টুথ পেষ্ট ব্যবহার করলে ৬ মাসে দাঁতের শির- শির কমে আসতে পারে। তবে এই ধরনের পেস্ট দীর্ঘদিন  ব্যবহার করা  নিরাপদ না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here