বিদ্যুৎবিহীন ‘বোতল বাতি’

0
45

নগরীতে ‘ঘটা করে আলোর মিছিল’ করলেও বাংলাদেশের প্রায় ৫৫.২ শতাংশ মানুষ এখনো বিদ্যুতের আলো বঞ্চিত (বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদন)। পাহাড়ি অনেক গ্রামেই রাত কাটে অন্ধকারে। আবার প্রযুক্তিময় এই সময়ে ‘অর্থ’ আর ‘প্রাপ্যতা’র কাছে হার মানতে হয়। এমন বিভাজন ঘটাতে বরাবরই এগিয়ে এসেছে প্রযুক্তি। বোতলে পুরে ‘এক লিটার আলো’ নিয়ে!

কি চোখ কপালে উঠছে? আলো আবার এক লিটার হয় কী করে! খটকা লাগতেই পারে। তাহলে এবার ঝেড়েই কাশি। এতো দিন যারা ‘বোতল ভূত’ এরর কথ শুনেছেন; এবার তারা কান খাড়া করুন। বলছি ‘বোতল বাতি’ যুগের কথা।

নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে বাতিটি আর কিছু নয় একটি বোতল মাত্র। এটি প্রথম উদ্ভাবিত হয় ব্রাজিলে, আলফ্রেদো মোসার নামে একজন মিস্ত্রী এটি আবিষ্কার করেন। পরবর্তিতে ফিলিপাইনে ইলিয়াক ডাইয়াজ নামে একজন উদ্যোক্তা এবং সমাজসেবী এর প্রচার শুরু করেন। সেই থেকে এই প্রকল্পের নাম হয় A Liter of Light. এটি আন্তর্জাতিক একটি প্রকল্প। সুইজারল্যান্ড, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, ব্রাজিল সহ বেশ কিছু দেশে অন্তত ১০ লক্ষ ঘরে এই বাতি আলো দিচ্ছে। এবং তা সম্পূর্ণ বিনামুল্যে।

মাত্র দুই লিটার পানি দিয়ে বিশেষ প্রযুক্তিতে পরিষ্কার পানির সাথে একটি কেমিক্যালের সংমিশ্রণে তৈরি করে ৫০-৬০ ওয়াটের আলো দেয় ‘বোতল বাতি’। যেকোন টিনের চাল আছে এমন ঘরেই এটি স্থাপন করা সম্ভব। আর খরচ নামমাত্র। আবার নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত পাওয়া যাবে। ঘন ঘন বিদ্যুত বিভ্রাটের কোনো বালাই থাকবে না। তেল কিনতে হবে না। একইসঙ্গে মাস শেষে বিদ্যুত বিল পরিশোধেরও বালাই থাকছে না।

ফটিকছড়ির ‘বোতল বাতি’
ইতিমধ্যেই ব্যয়শূন্য বিদ্যুত প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার রোসাংগিরি ইউনিয়নে। লাইটস ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই ইউনিয়নে শীলের হাট বাজার এবং আশেপাশের বাড়িতে গত ৮ মে থেকে শুরু হয় ‘বোতল বাতি’ প্রকল্প। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের একঝাঁক স্বেচ্ছাসেবী তরুণদের সামাজিক সংগঠন এই বোতল বাতির ধারণা চট্টগ্রামে নিয়ে এসছে।

এ বাতি ব্যাবহারে প্রতিমাসে ১০০-২০০ টাকা বিদ্যুত সাশ্রয় করা সম্ভব। একবার লাগালে ৪-৫ বছর পর্যন্ত কোন খরচ নেই।

শীলের হাট এবং মজুমদার বাড়িতে মোট ১০টি বোতল বাতি স্থাপিত হয় বিনামূল্যে। গ্রামের বিদ্যালয় পর্যায়ের ১০ জন শিক্ষার্থী লাইটস ফাউন্ডেশনের সাথে কাজ করে এবং তাদের হাতে কলমে শেখানো হয় এ বাতি তৈরি। বোতল বাতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ সবার। প্রায় ২০ জন এর মধ্যেই তাদের ঘরে এ বাতি স্থাপনের জন্য অনুরোধ করেছেন বলে জানিয়েছেন লাইটস ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠাতা সানজিদুল আলম।

তিনি বলেন, ‘বোতল বাতি’ অন্ধকার ঘর গুলোতে আলোর সঞ্চার করে বিনা পয়সায়। বাতিটি যেন রাত এবং দিন দু-সময়েই আলো দিতে সক্ষম করতে আমরা এখন এ বাতির নতুন সংস্করণ তৈরিতে গবেষণা করছি।

যেভাবে তৈরি হয় ‘বোতল বাতি’
বললেন, এটি বানাতে মূলত ২ লিটার পেপসি বা কোকাকোলার বোতল, পরিষ্কার পানি, ১ বর্গফুট টিন, ক্লোরিন (সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট) লাগে। এবং এটি তৈরি করে শুধু টিন কেটে মাঝে লাগিয়ে দিলেই এটি থেকে দিনের বেলা প্রায় ৬০ ওয়াটের আলো পাওয়া যায়। এটি ব্যবহারে দেখা গেছে প্রতি মাসে ১০০-১৫০ টাকা বিদ্যুত সাশ্রয় হয়। বৈদ্যুতিক বাতি থেকে যে কার্বন নিস্বরিত হয় সেটি থেকে মুক্ত থাকা যায়। এটি তৈরিতে খরচ হয় ১৫০-২০০ টাকার মত। এর স্থায়িত্বকাল প্রায় ৪-৫ বছর।

কারিগর-লাইটস ফাউন্ডেশন
লাইটস ফাউন্ডেশনের ইঞ্জিনিয়ারিং দল এখন গবেষণা করছে রাতে জ্বলবে এমন ‘বোতল বাতি’ তৈরির উপর। খুব শিগগিরি এটি তৈরি হয়ে যাবে এবং অচিরেই এইবাতি তৈরির প্রণালী সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবেও বলে জানান বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লাইটস ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠাতা।

‘বোতল বাতি’ প্রকল্পটি আসলে মানুষের জন্য কতটা প্রয়োজন তা নিয়েও জরিপ চালানো হচ্ছে জানিয়ে সানজিদ বললেন, এর উপর ভিত্তি করে তারা এ প্রকল্পের কাজকে বর্ধিত করবে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রোসাঙ্গিরি ইউনিয়নের রোসাঙ্গিরি উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকশ ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে একটি কর্মশালা করানো হবে বোতল বাতি তৈরি এবং এর ব্যবহার নিয়ে।  বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কর্মশালার মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবকদের একটি প্রশিক্ষিত দল তৈরি হবে যারা তাদের নিজ এলাকায় এ বোতল বাতি নিয়ে কাজ করতে পারে। প্রশিক্ষণার্থীরা নিজেরাই যেন তাদের গ্রামে এ বাতি স্থাপন করে সমাজের প্রতি তাদের দায়ত্বি পালনের চর্চা শুরু করবে।

এ জন্য লাইটস ফাউন্ডেশন যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা করবে। আর এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সবার আগে ফাউন্ডেশনের পাশে দাঁড়িয়েছেন লায়ন্স ক্লাব ইন্টারনেশনাল এর লিও ক্লাব চট্টগ্রাম ডিস্ট্রিক্ট চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ ইসলাম। তবে এর পরিসর বাড়াতে পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তা পেলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, শহরের বস্তি সহ যেকোন সুবিধাবঞ্চিত মানুষকেই এ বাতির আওতায় আনা সম্ভব হবে।

২০১৩ এর শেসের দিকে লাইটস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সানজিদুল আলম সিবান শান ইউটিউবে ইলেক্ট্রনিক্স প্রকল্প নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে একটি ভিডিও পান। যেখানে দেখা গেছে, একটা সাধারণ বোতল কিভাবে বাতি হিসাবে কাজ করে। এর পর আরও খোঁজখবর করার পর জানতে পারেন ঢাকার একদল তরুণ এ বোতল বাতি নিয়ে কাজ করেছে,কিন্তু চট্টগ্রামে এটি হয়নি। তিনি নিজ উদ্যোগে তখনই চেষ্টা করেন এটি নিয়ে চট্টগ্রামে কাজ করতে।

কিন্তু কাজ করার জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ায় তখন আর করা হয়নি। ২০১৫ তে এসে তিনি পরিচিত একজন তরুন রবিউল হোসাইন রাহাতকে এ ব্যাপারে জানান, যিনি সামাজিক কাজের সাথে জড়িত। রাহাদ এর পর তার কিছু সমমনা বন্ধুদের নিয়ে যোগাযোগ করেন সানজিদুল এর সাথে। এভাবেই শুরু লাইটস ফাউন্ডেশনের। বর্তমানে তারা দুজন ছাড়া প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসাবে আহমেদ সাকিব আর রাফি, সালমান খান ইয়াসিন এবং একজন অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার এম এ রহমান আসিফ সহ তারা ৫ জনের একটি দল। প্রতিদিনই নতুন কেউ যুক্ত হচ্ছেন তাদের সাথে এই উন্নয়নমূলক কাজে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here